বিনিয়োগের হিসাব রাখবেন কীভাবে — মুনাফা, মূলধন আর শেয়ার এক জায়গায়
বাংলাদেশে অনেক পরিবারই কোনো না কোনোভাবে বিনিয়োগ করে রাখেন। কেউ পরিচিত কারও ব্যবসায় টাকা দিয়ে প্রতি তিন মাসে মুনাফা নেন, কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে শেয়ার কিনে রাখেন, কেউবা নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে টাকা খাটান। কিন্তু বিনিয়োগ করার পর সেই টাকার হিসাব ঠিকভাবে রাখা হয় খুব কম পরিবারেই।
ফলে কিছুদিন পর প্রশ্নগুলো ঘোলাটে হয়ে যায় — এ পর্যন্ত মোট কত মুনাফা পেয়েছি? পরের কিস্তি কবে পাওয়ার কথা? চুক্তি শেষ হতে আর কত বাকি? মূলধনটা ফেরত আসবে তো? এই লেখায় দেখব, খাতা বা এলোমেলো স্প্রেডশিট ছাড়াই কীভাবে বিনিয়োগের পুরো হিসাব গুছিয়ে রাখা যায়।
কেন সাধারণ খাতায় বিনিয়োগের হিসাব হারিয়ে যায়
সংসারের দৈনন্দিন খরচের সাথে বিনিয়োগের হিসাব মিশে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় — মুনাফা আর মূলধন আলাদা করা যায় না। তিন মাস পরপর যে টাকা হাতে আসে, সেটা কি লাভ, নাকি আপনার দেওয়া মূল টাকা ফেরত? খাতায় শুধু "৭,৫০০ টাকা পেলাম" লিখে রাখলে ছয় মাস পর আর মনে থাকে না।
দ্বিতীয় সমস্যা তারিখ। মুনাফা নিয়মিত আসার কথা থাকলেও, কবে সর্বশেষ পেয়েছেন আর পরেরটা কবে — এটা মাথায় রাখা কঠিন। এক-দুই কিস্তি দেরি হলে বা বাদ পড়লে অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, একাধিক বিনিয়োগ থাকলে মোট ছবিটা আর চোখে পড়ে না — কোন বিনিয়োগে ভালো লাভ হচ্ছে, কোনটায় টাকা আটকে আছে অথচ কিছুই ফিরছে না।
আসলে কোন তথ্যগুলো রাখা দরকার
বিনিয়োগের হিসাব রাখতে খুব বেশি কিছু লাগে না, কিন্তু কয়েকটা তথ্য অবশ্যই রাখা দরকার।
মূলধন — অর্থাৎ আপনি মোট কত টাকা দিয়েছেন। বিনিয়োগের তারিখ — কবে টাকাটা দিয়েছেন। মেয়াদ — চুক্তি কবে শেষ হবে এবং মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরত আসবে কিনা। প্রতিটি প্রাপ্তি — কবে, কত টাকা, এবং সেটা মুনাফা নাকি মূলধন ফেরত। আর সব মিলিয়ে ROI — অর্থাৎ মূলধনের বিপরীতে এ পর্যন্ত কত শতাংশ লাভ হয়েছে।
এই কয়টা তথ্য এক জায়গায় থাকলেই যেকোনো সময় বলা যায় — এই বিনিয়োগ থেকে আমি কতটা ফেরত পেয়েছি, আর কতটা এখনো বাকি।
দুই ধরনের বিনিয়োগ, দুই রকম হিসাব
বেশিরভাগ পারিবারিক বিনিয়োগ মোটামুটি দুই ভাগে পড়ে।
প্রথমটা মুনাফা-ভিত্তিক। এখানে আপনি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেন, বিনিময়ে নিয়মিত — মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক — মুনাফা পান, আর মেয়াদ শেষে মূল টাকাটা ফেরত আসে। এই ধরনের বিনিয়োগে মুনাফার তারিখ আর মূলধন ফেরত — দুটোই আলাদা করে রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়টা শেয়ার বা মালিকানা। কোনো ব্যবসায় আপনি টাকা দিয়ে একটা অংশের মালিক হন। এখানে নিয়মিত মুনাফা নাও থাকতে পারে — বরং আপনার শেয়ারের শতকরা হার আর ব্যবসার বর্তমান মূল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা লাভ করা শুরু করলে তখন সেই লভ্যাংশ যোগ করতে থাকবেন।
দুই ধরনের হিসাব আলাদা রাখলে বিভ্রান্তি কমে — মুনাফার বিনিয়োগে চোখ থাকে তারিখ আর মূলধনের দিকে, শেয়ারে চোখ থাকে মালিকানা আর মূল্যের দিকে।
মুনাফার তারিখ যেন আর মিস না হয়
নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুলে যাওয়া। তিন মাস পরপর যখন টাকা আসার কথা, তখন যদি নিজেই মনে না রাখেন, কিস্তি দেরি হলে বা বাদ পড়লে ধরা কঠিন।
তাই বিনিয়োগের তারিখ আর কত পরপর মুনাফা আসবে — এটুকু একবার সেট করে রাখলে, পরের প্রাপ্তির সময় কাছাকাছি এলে একটা মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। তাহলে প্রতিবার নিজে হিসাব না করেও জানতে পারবেন — এবার মুনাফা পাওয়ার সময় হয়েছে, পেয়েছি কি।
দুজনে অ্যাপে বিনিয়োগের হিসাব
দুজনে অ্যাপে এখন আলাদা একটা বিনিয়োগ সেকশন আছে, যেখানে ঠিক এই কাজগুলোই করা যায়। প্রতিটি বিনিয়োগের মূলধন, তারিখ, মেয়াদ আর ধরন রাখা যায়; প্রতিবার মুনাফা বা মূলধন ফেরত পেলে সেটা তারিখসহ যোগ করা যায়; আর অ্যাপ নিজে থেকেই মোট মুনাফা আর ROI হিসাব করে দেখায়।
মুনাফা-ভিত্তিক বিনিয়োগে মেয়াদের অগ্রগতি আর পরের মুনাফার সম্ভাব্য তারিখ দেখা যায়, আর সময় হলে অ্যাপ মনে করিয়েও দেয়। শেয়ারের ক্ষেত্রে আপনার মালিকানার শতাংশ আর বর্তমান মূল্য রাখা যায়। সব বিনিয়োগ মিলিয়ে একটা সারসংক্ষেপও থাকে — মোট কত বিনিয়োগ, মোট কত মুনাফা।
সবচেয়ে বড় সুবিধা — এই হিসাব সংসারের বাকি খরচ-আয়ের সাথেই এক জায়গায় থাকে, আলাদা কোনো স্প্রেডশিট মেইনটেইন করতে হয় না।
ছোট কিছু পরামর্শ
বিনিয়োগ করার দিনই মূল তথ্যগুলো তুলে রাখুন — মূলধন, তারিখ, মেয়াদ। পরে মনে করে বসাতে গেলে ভুল হয়।
সম্ভব হলে চুক্তিপত্র বা টাকা দেওয়ার প্রমাণের একটা ছবি রেখে দিন। কোনো মতভেদ হলে এটা কাজে লাগে।
প্রতিবার মুনাফা পাওয়ার সাথে সাথেই যোগ করুন, জমিয়ে রাখবেন না। তাহলেই বছরের যেকোনো সময় সত্যিকারের ছবিটা হাতের কাছে থাকবে।
আর মনে রাখবেন, হিসাব রাখা আর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া এক জিনিস নয় — এই লেখা শুধু নিজের বিনিয়োগের হিসাব গুছিয়ে রাখার জন্য, কোথায় বিনিয়োগ করবেন সেই পরামর্শ নয়।